বাংলার প্রথম পত্রিকা ও পৃথিবীর প্রথম মহামারী ওলাওঠা

কুলদা রায়

প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পন প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের ২৩ মে। সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান। কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত সংবাদপত্রটিতে লিখতেন। শুরুতে সমাচার দর্পন সাপ্রাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হলেও পরে সপ্তাহে দুদিন প্রকাশিত হত।

জয়গোপাল তর্কালঙ্কার বাংলা সংবাদ রচনা ও সঙ্কলনে সম্পাদকের সহায়ক ছিলেন বলে তা উন্নতমানের সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সমর্থ হয়েছিল। সংবাদ, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিষয়াদির বিবরণ এই পত্রিকায় স্থান পেত। সে আমলে প্রগতিশীল পত্রিকা হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পত্রিকাটি অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল। তবে পরেও কয়েকবার এই পত্রিকা পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল।



সমাচারদর্পনের মত সাময়িকপত্রের মধ্যে দিয়ে শিক্ষিত বাঙালি প্রথম গদ্যরচনার রস গ্রহণ করতে শেখে। তখনকার বাংলা সাহিত্য বলতে সবই পদ্য রচনা ছিল। সমাচারদর্পনের প্রকাশ হবার ফলে পাঠকের সংখ্যা বাড়তে লাগল এবং আরো সাময়িকপত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পেল। এর ফলে বাংলা গদ্য সাহিত্যের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথও খুলে গেল।

সমাচারদর্পনের জনপ্রিয়তার ফলে আরো কয়েকটি সাময়িক ও সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে প্রধান ছিল সংবাদকৌমুদী (১৮২১) এবং সমাচারচন্দ্রিকা (১৮২২)। ১৮৪১ সালে সমাচার দর্পন বন্ধ হয়ে গেলেও পরে আরো কিছুদিন অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এই সমাচার দর্পন পত্রিকা প্রকাশের ৬ মাস পরে পত্রিকাটিতে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদের লেখা প্রকাশিত তথ্য অনুসারে জানা যায় যশোরে ওলাওঠা রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব হয়েছে। শত শত লোক মারা যাচ্ছে। রোগটি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। দেড় বৎসর যাবৎ এই রোগটি মহামারি রূপে দেখা দিলেও তার কারণ অজানা। এই ওলাওঠা রোগটিই কলেরা রোগ নামে পরিচিত।

কলেরার ইতিহাস

পৃথিবীতে প্রথম কলেরা রোগটির প্রাদুর্ভাব বঙ্গদেশের ঘটে। সেটা গঙ্গানদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে স্বাস্থ্য-ইতিহাসবিদগণ মনে করেন। মহামারীরূপে পৃথিবীতে প্রথম কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটে ১৮১৭ সালে। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এটা এটা লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটায়। ১০ হাজার বৃটিশ সৈন্যো মারা যায়। এর কারণ হিসেবে চরম দরিদ্রতা, দূষিত পানীয় জলকে দায়ী করা হয়।

বঙ্গদেশ থেকে কলেরা রোগটি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ১৮১৭ সালেই বানিজ্য স্থল ও জলপথে দক্ষিণ এশিয়া, চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়াতে যায়। ১৮২৭ থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয়বারের মত কলেরা মহামারী রূপে আক্রমণ করে এই সমস্ত দেশে। এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়ো এর বিস্তার ঘটে। এই সময়কালে আমেরিকাতে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায় কলেরাতে।
এরপর ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভয়াবহভাবে কলেরার বিস্তার ঘটে।

১৮৩৯ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত কলেরার মহামারীতে আক্রান্ত হয় উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা। প্রথমবারের মতো ব্রাজিলে আক্রমণ ঘটে।

১৮৬৩-১৮৭৫ পর্যন্ত সাব-সাহারা অঞ্চলে কলেরা আঘাত হানে।

১৮৮১-১৮৯৬ পর্যন্ত পঞ্চম এবং ১৮৯৯-১৯২৩ সাল পঞ্চম ও ষষ্ঠবারের মত পৃথিবীব্যাপী কলেরা মহামারী হয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন হরণ করে। মিশর, আরব, পারস্য, ভারত ও ফিলিপাইনে কলেরার আক্রমণ হয় অন্যান্য দেশের তুলনায় ভয়ঙ্কর। ১৮৯২ সালে জার্মানী ও ১৯১০-১৯১১ সালে নেপলসে কলেরার আঘাত ছিল বেশি ধ্বংসাত্মক। ১৯৬১ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে যে কলেরা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তা ছিল সর্বশেষ প্রাণঘাতী আক্রমণ। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে মারা যায় ১ লক্ষ মানুষ। ১৯৬৩ সালে পূর্ব পাকিস্থানে কলেরা মারাত্মকভাবে দেখা দেয়। ১৯ শতকে সারা পৃথিবীতে ১০ কোটি মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ১৮৪৭-১৮৫১ সালে রাশিয়াতে মারা যায় ১০ লক্ষ মানুষ।.১৯০০-১৯২০ সালে ভারতে মারা যায় আশি লক্ষ মানুষ।

১৮৮৩ সালে বিজ্ঞানী কক (Koch) Vibrio cholerae জীবাণু আবিষ্কার করেন। এটি একটি কমা (,) আকৃতির ব্যাকটেরিয়া যা কলেরা আক্রান্ত রোগীর মলে দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়ায়। শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর এ জীবাণু ক্ষুদ্রান্ত্রের গায়ে লেগে যায় এবং সেখানে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এ সময় জীবাণু বিষ (Toxin) উৎপন্ন করে। এ বিষ রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্যাংলিওসাইড (ganglioside) নামে ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাইগুলিতে অবস্থান করে। এর ফলে জীবাণুর বসবাসের স্থানে ব্যাপকভাবে এডেনাইলেট সাইক্লেজ এনজাইমের (adenylate cyclase) কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। এ এনজাইম মূলত সাইক্লিক এএমপি (cAMP) তৈরির জন্য দায়ী যেটি ভয়ঙ্করভাবে অন্ত্রের নাড়াচাড়া বৃদ্ধি করে যার ফলে প্রচুর পাতলা পায়খানা হয়। প্রাথমিকভাবে কলেরা রোগে দেহের প্রচুর তরল পদার্থ ও Eletrolytes হারিয়ে যায়। কলেরা আক্রান্ত রোগী একদিনেই ৩০ লিটারের মতো তরল পদার্থ (মল) ত্যাগ করতে পারে। পানি শূন্যতায় মারা যায়।




বাংলার কলেরার দিনগুলোর 
সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার একটুখানি


সেই কালপর্বে ১৭৫৬ সালে পলাশীর আম বাগানে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ইংরেজরা পরাজিত করে। নয় বছর পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা-বিহার-উড়িশ্যার দেওয়ানী লাভ করে। তারা কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলাকে কয়েকটি বিভাগে ভাগ করে। মোগলদের আমলে যারা কর আদায় করতেন তাদের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নানা কায়দায় বেশি বেশি কর আদায়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

১৭৭০ সালে বাংলায় ভয়াবহ মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অনাহারে, অপুষ্টিতে, রোগে, শোকে তখনকার বাংলার এক তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়। মৃত লোকদের জমির খাজনা প্রতিবেশীর কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী আদায় করার নীতি গ্রহণ করে। সে সময়কার এক তৃতীয়াংশ লোক মন্বন্তর ও ইস্ট কোম্পানীর ভয়ে বনে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। এদের অধিকাংশ বাঘের পেটে, কুমিরের পেটে মারা যায়। বাংলায় মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষ মাত্র বেঁচে ছিল। এই দুর্ভিক্ষের ফল বাংলার মানুষকে বয়ে বেড়াতে হয় বহুকাল ধরে।

এই দুর্ভিক্ষের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী পাঁচশালা পরিকল্পনা করে ১৭৭২ সালে। সে বছরই বাংলার গণজাগরণের প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন। এবং এই বছর থেকেই কোলকাতায় ইংরেজরা তাদের অনুগত ধনী বাঙালীদেরকে বাবু নামে ডাকতে শুরু করে। ধনী মুসলমানদেরকে বলা হতে থাকে সাহেব।

১৭৯৩ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর মাধ্যমে নব কলেবরে জমিদারী পদ্ধতি চালু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনী। । বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময়কালে দেশজুড়ে ছিল ঘোর বিশঙ্খলা এবং কোম্পানি ও তার ইজারাদার জমিদার প্রভৃতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ। এ অসন্তোষ দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, চোয়াড় বিদ্রোহ, বাঁকুড়ার বিদ্রোহ এবং ফকির সন্যাসীর বিদ্রোহ ঘটে।

১৭৯৩ সালে উইলিয়াম কেরি ভারতে আগমন করেন। ১৮৮০ সালে কোলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হয়। উইলিয়াম কেরি শ্রীরামপুরে খ্রিস্টান মিশনে চলে আসেন। এই সময় থেকেই বাংলা গদ্যের প্রচলন করার চেষ্টা করা হয়।

১৮১৮ সালে বাংলায় যে ওলাওঠা বা কলেরা রোগটি ছোবল মারতে শুরু করে তখন দ্বারকানাথ ঠাকুরের বয়স মাত্র চব্বিশ বছর। তার পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র এক বছর। এর দু বছর পরে বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছেন মহামারীর মধ্যে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামে আধুনিক ঔপন্যাসিকে্র জন্ম হয় ঠিক এর ২০ বছর পর। মহামারীর ৪৭ বছর পরে তিনি দূর্গেশনন্দীনী নামে প্রথম উপন্যাস লেখেন। তার পরের বছরই লেখেন ফকির-সন্নাসীর বিদ্রোহকালের সময় নিয়ে উপন্যাস কপালকুণ্ডলা। এই উপন্যাসে মন্বন্তর-উত্তরকালে বিপর্যস্ত বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার চিত্র পাওয়া যায়।

সমাচার দর্পনের ভাষা সহজ। তখনো যতি চিহ্নের ব্যবহার শুরু হয়নি। শুধু দাঁড়ি (।) চিহ্ন দেখা যায় একটি স্তবকের পরে। তবে পড়তে কষ্ট হয় না।

সমাচার দর্পন পত্রিকায় ১৮১৮ সালে যে কলেরা বা ওলাওঠার খবর পাওয়া যাচ্ছে, এই সংবাদগুলোর ভাষার দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায় বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কলেরা-পীড়িত মানুষের অবস্থা ছিল অতি ভয়াবহ। মানুষ মরছে চিকিৎসার অভাবে। ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এ এক ভয়ঙ্কর অসহায় পরিস্থিতি।

সে সময়কালের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল। কোনো টেলিফোন, টেলিগ্রাফ তখনো আসেনি। ফ্যাক্স, ইমেইল চিন্তার অতীত। প্রতিটি এলাকায় সংবাদদাতা নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে প্রকৃত অবস্থার সামান্য বিবরণীই সংবাদপত্রে এসেছে। পরিস্থিতি ছিল আরো ভয়াবহ।
১৮৮০ সাল থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকায় কলেরার যে মহাদূর্যোগ হয়েছিল, সেটা নিয়ে কলাম্বিয়ার ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ আশির দশকে লাভ ইন দি ডেজ অফ কলেরা উপন্যাস লেখেন। বইটি স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৮ সালে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
বাংলায় যে কলেরার মহাদূর্যোগ হয়েছিল তা নিয়ে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য উপন্যাস রচিত হয়নি।

সমাচার দর্পনে প্রকাশিত
 সংবাদগুলোর কয়েকটি এখানে দেওয়া হল--

২১ নবেম্বর ১৮১৮। ৭ অগ্রহায়ণ ১২২৫।
যশোহর।-- যশোহরে যে২ লোকের ওলাওঠা হইয়াছিল তাহারা হরিতাল ভস্ম ঔষধি সেবন করিয়া রক্ষা পাইয়াছে এবং যাহারদিগের নাড়ি ত্যাগ ও হিমাঙ্গ প্রভৃতি মৃত্যুচিহ্ন হইয়াছিল তাহারাও ঐ হরিতাল ভস্ম দ্বারা রক্ষা পাইয়াছে হিন্দুস্থানমধ্যে পূর্ব্ব দক্ষিণ উত্তর পশ্চিম যত দেশ প্রদেশ আছে সম্বৎসরের মধ্যে ওলাওঠা রোগ না হইয়াছে এমত দেশ ও প্রদেশ দেখিলাম না ও শুনিলাম না কিন্তু দেড় বৎসর পর্যন্ত এ রোগ হইয়াছে তথাপি ইহার কারণ কেহ কোন স্থানে নিশ্চয় করিতে পারিল না ইহাতে অনুমান এই হয় যিনি মৃত্যু তিনি অন্ধকার হইতে বিষাক্ত বান নিক্ষেপ করিয়া লোক সংহার করিতেছেন।

২৯ এপ্রিল ১৮২০। ১৮ বৈশাখ ১২২৭
ওলাওঠা।--ওলাওঠা রোগে কলিকাতার এই২ ভাগ্যবান লোক মরিয়াছেন। বাবু সূর্য্যকুমার ঠাকুর ও বাবু মোহিনীমোহন ঠাকুর ও কোম্পানির ত্রেজুরির খাজাঞ্চি জগন্নাথ বসু ও কলিকাতার একশ্চেঞ্জ ঘরের কর্ম্মকারী শিবচন্দ্র বসু। এবং ইংগ্লণ্ডীয় সাত জন সাহেব মরিয়াছেন।

৬ মে ১৮২০। ২৫ বৈশাখ।
ওলাওঠা--ওলাওঠা রোগ এতদ্দেশে কতক পরাক্রম সম্বরণ করিয়াছে যেহেতুক যাহারদের২ ঐ রোগ হইতেছে তাহাদের মধ্যে অনেকে রক্ষা পাইতেছে কিন্তু সমাচার পাওয়া গেল যে মোং যশোহর প্রদেশে তাহার পরাক্রম অতিশয়। সেখানে কোন২ গ্রাম ঐ রোগে উচ্ছিন্ন হইয়াছে তাহাতে মুসলমান লোক মরিলে লোকাভাবপ্রযুক্ত তাহারদের গোর হওয়া ভার এবং হিন্দুলোকের প্রায় সৎকার হয় না। একবার নামে একবার উঠে ইহাতেই নাড়ী বসিয়া গিয়া ক্ষণেক কাল পরে মরে।

২৭ এপ্রিল ১৮২২ ।। ১৬ বৈশাখ ১২২৯
সহগমন।।–ওলাওঠা রোগে অনেক বাঙ্গালি মরিয়াছে তাহার মধ্যে ঐ [গয়া] মোকামে এক ব্রাহ্মণ মরিলে তাহার স্ত্রী সহগমনে উদ্যতা হইল তাহাতে গয়ার জজ শ্রীযুত মেং কিরিষ্টফর স্মিথ সাহেব গিয়া তাহাকে অনেক নিষেধ করিলেন তাহাতে সে ব্রাহ্মণী আপন অঙ্গুলী অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া পরীক্ষা দেখাইল তাহা দেখিয়া জজ সাহেব আজ্ঞা দিলেন যে তোমার যে ইচ্ছা তাহা করহ। পরে সে স্ত্রী সহগমন করিল।

১ মে ১৮২৪। ২০ বৈশাখ।
ওলাওঠা।-- শুনা গেল যে নব্দ্বীপে রোজ২ ওলাওঠা আপন সৈন্য সন্নিপাত সমভিব্যাহারে গমনানন্তর অবিরোধে রাজ্য শাসন করিয়া অতিশয় প্রবল হইয়া বসিয়াছেন। এবং তাহার সহকারী হইয়া অনাবৃষ্টি ও গ্রীষ্ম সুখে কালক্ষেপণ করিতেছে। ঐ রোগরাজের আজ্ঞানুসারে সন্নিপাত সৈন্য মহোৎপাত করিইয়া বহু লোককে কাতর করিয়াছে এবং করিতেছে। এক দিবস ঐ রোগরাজ নবদ্বীপে বহু জনতা দেখিয়া কোপাবিষ্ট হইয়া সন্নিপাতকে কহিলেন তুমি আমার কর্ম্মে আলিস্য করিতেছ তাহাতে সন্নিপাত আপন ক্ষমতা প্রকাশ করিয়া এক দিবসেই ছত্রিশ জনের প্রাণ নষ্ট করিয়াছে এবং অদ্যাপিও ঐ রাগে প্রতিদিন দশ বারো জনকে নষ্ট করিতেছে তাহাকে নিবারণ করে এমত কাহার ক্ষমতা হয় না। ইহা দেখিয়া ভয়ে ভীত হইয়া বিদেশী যে সকল লোক নবদ্বীপে বাস করিতেছিল তাহারা পলায়নপর হইয়াছে ও প্রতিদিন ক্রন্দন ধ্বনিতে সুস্থ লোকেরো ভয় জন্মিতেছে এবং শোকাবিষ্ট লোকেরো শোকশান্তি হইতেছে এরূপ যদ্যপি আর কিছু কাল নবদ্বীপে ঐ সৈন্য সমভিব্যাহারে ওলাওঠা প্রবল হইয়া বসতি করেন তবে ঐ নবদ্বীপ দ্বীপমাত্র হইবেক।

২৭ আগষ্ট ১৮২৪ ।। ১৩ ভাদ্র ১২৩২
সহগমন।।–সিমল্যানিবাসি ফকিরচন্দ্র বসু ১ ভাদ্র সোমবার ওলাওঠারোগে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছেন। ইহার বয়ঃক্রম প্রায় ৩৬ বৎসর হইয়াছিলো তাঁহার সাধ্বী স্ত্রী শ্যামবাজারনিবাসি শ্রীমদনমোহন সেনের কন্যা তাঁহার বয়ঃক্রম ন্যূনাতিরেক ২২ বৎসর হইবেক এবং সন্তান হয় নাই। ঐ পতিব্রতা স্ত্রী রাজাজ্ঞানুরোধে দুই দিবস অপেক্ষা করিয়া বুধবার প্রাতে সুরের বাজারের নিকট সুরধুনী তীরে স্বামিশবসহ জ্বলচ্চিতারোহণপূর্ব্বক ইহলোক পরিত্যাগ পুরঃসর পরলোক গমন করিয়াছে।

১৭ সেপ্টেম্বর ১৮২৫। ৩ আশ্বিন ১২৩২
ঢাকা।--ঢাকার পত্রদ্বারা ওলাওঠা রোগের বিষয় যেরূপ শোনা গেল তাহাতে প্রায় বিশ্বাস হয় না বিশেষতো গত মাসের শেষ সপ্তাহে আট শত লোক পঞ্চত্ব পাইয়াছে এবং বর্ত্তমানে মাসের প্রথম সপ্তাহে সাত শত লোক মারা পড়িয়াছে। পত্রলেখক সাহেব লিখিয়াছেন যে ইহাতে লোকদের মধ্যে অতিশয় ভয় জন্মিয়াছে এবং হাহাকার উঠিয়াছে লোকেরা স্থান ও কাষ্ঠের অভাবহেতু শব দাহ করিতে পারে না। এক্ষণে আদালত ও অন্য২ কার্য্যকর্ম্ম সকল বন্ধ হইয়াছে এবং লোকেরা পলায়ন করিতেছে। এই রোগে সকলেরই ভয় জন্মিতে পারে যেহেতুক কোন ঔষধেতে কিছু উপকার দর্শে না।

৩ সেপ্টেম্বর ১৮২৫। ২০ ভাদ্র ১২৩২
ওলাওঠা।।-- শহর কলিকাতার মধ্যে মধ্যে যেরূপ ওলাওঠা রোগের প্রাবাল্য হইয়াছে তাহার বর্ণনা করিতে লেখনি অসমর্থা যাঁহারা মফস্বলে আছেন তাহারা প্রায় ইহাতে বিশ্বাস করিবেন না কিন্তু তাঁহারা ভাগ্য করিয়া মানুন যে এ সময় তাহারা কলিকাতায় নহে। কলিকাতায় লোক প্রতিদিন মরিতেছে তাহার সংখ্যা করা সুকঠিন কিন্তু আমরা শুনিয়াছি যে এই সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন যদি চারি শত করিয়া ধরা যায় তবে প্রায় সমান হইতে পারিবে এবং কিছু কমও বা হয়। এ সপ্তাহে মুসলমান অধিক মরিতেছে বিশেষত আমরা শুনিয়াছি যে একদিনের মধ্যে ৫৭১ পাঁচশত একাত্তর জন লোক মরিয়াছে কিন্তু ইহাতে প্রায় বিশ্বাস হয় না যে হউক তাহার কারণ সকলেই কহিতেছে যে সম্প্রতি মুসলমানদের মহরমেতে একাদিক্রমে তিন চারি রাত্রি জাগরণ করিয়াছিল ও আর২ অত্যাচার করিয়াছিল এইহেতুক অধিক মুসলমান মরিতেছে। এবং যাহারা কদর্য্য গলির মধ্যে বাস করে তাহাদের মধ্যেও অধিক লোক মরিতেছে যেহেতু কদর্য্য স্থানের দুর্গন্ধেতে ও মন্দ বায়ুতে এ রোগ জন্মে।যাহারা বড় রাস্তার ধারে উচ্চ স্থানে বাস করে তাহাদের মধ্যে এত লোক মরে নাই। মুসলমানেরা এক হস্ত গভীর মৃত্তিকা খনন করিয়া কবর দেয় তাহাতে আরো মন্দ হয় যেহেতুক রাত্রিকালে শৃগালাদি আসিয়া মৃত্তিকার মধ্য হইতে শব বাহির করে পরে সেই সকল শব পচিয়া অতিশত দুর্গন্ধ হয়।

অনেকে ভয়েতে মরে ওলাওঠা রোগে ভয় অপেক্ষা প্রবল উপসর্গ আর নাই এবং অনেকে ঐ ভয়েতে রোগগ্রস্ত হয় পরে হঠাৎ গঙ্গাতীরে লইবার উদ্যোগ হয় তাহাতে রোগির যত সাহস-বৃদ্ধি হয় তাহা প্রায় সকলেই বিবেচনা করিতে পারেন। যখন রোগীকে কহা যায় যে তোমাকে গঙ্গাযাত্রা করিতে হইবে তখন সে ভাবে যে এই আমার অগস্ত্যযাত্রা। আরো আমরা দেখিতেছি যে রোগের প্রথমাবস্থাতে যাহারা সাহেবলোকদের ঔষদ সেবন করে তাহাদের ভেদ বমি তৎক্ষণাৎ বন্দ হয় এবং অনেকে রক্ষা পায় কিন্তু খেদপূর্বক লেখা যাইতেছে যে অনেক লোক রোগের প্রথমাবস্থাতে না আসিয়া শেষাবস্থাতে আইসে তাহাতে ঔষধ কিছু করিতে পারে না কিন্তু রোগ হইবামাত্র যত লোক ঔষধ সেবন করিয়াছে তাহারদের মধ্যে প্রায় অনেকে রক্ষা পাইয়াছে।
সম্প্রতি মোং শালিখাতে এক জন ভাগ্যবান লোক এই রোগে পীড়িত হইয়া গঙ্গাতীরে আসিয়া কফাভিভূত হইলে সকলে তাহার মৃত্যু নিশ্চয় করিয়া চিতা প্রস্তুত করিল ও মৃত ব্যক্তিকে চিতার উপরে তুলিয়া অগ্নি দিল। কিঞ্চিৎকাল পরে অগ্নির উত্তাপে সে উঠিয়া বসিল কিন্তু তাহার আত্মীয় অথবা উত্তরাধিকারী কোন ব্যক্তি তাহার মস্তকে যষ্ঠ্যাঘাত করিয়া তৎক্ষণাৎ খুন করিল এবং অগ্নির মধ্যে পুনর্বার নি:ক্ষেপ করিল। এই সমাচার অমূলক নয় যে সাহেব এই ব্যাপার প্রত্যক্ষ দেখিয়াছেন তাহার প্রমুখাৎ শুনা গিয়াছে।

শহর শ্রীরামপুরেও ওলাওঠা রোগ আগমন করিয়াছে কিন্তু বড় প্রবল হয় নাই চাতরা ও শ্রীরামপুর দুই গ্রামের মধ্যে প্রতিদিন তিন চারি জন করিয়া মরিতেছে।

কিন্তু রোগের প্রথমাবস্তাতে অর্থাৎ একবার কিম্বা দুইবার ভেদ হইলে যাহারদিগকে ঔষধ দেওয়া যায় তাহাদের মধ্যে প্রায় কেহ মরে না। সম্প্রতি চিকিৎসক নিযুক্ত করিয়া ঔষধ দেওয়াতে অনেকের রক্ষা হইতেছে। গত বুধবারে শ্রীরামপুরের যুগল আঢ্যের বান্ধাঘাটেতে ওলাওঠা রোগগ্রস্ত এক জন অনাথ বৈষ্ণবকে ফেলিয়া গিয়াছিল তাহার মুখে জল দিতে কোন লোক ছিল না পরে আমাদের প্রেরিত চিকিৎসক সেখানে গিয়া তাহাকে ওষধ দিতে লাগিল ও তিন দিবসের মধ্যে সে ব্যক্তি সুস্থ হইল। ঐ ঘাটে তৎকালে আর এক বেশ্যা অনেক পরিবারে পরিবৃতা হইয়া আসিয়াছিল এবং সেও ঔষধ খাইয়াছিল কিন্তু সে মৃতা হইয়াছে।

২২ ডিসেম্বর ১৮২৭। ৮ পৌষ।
ওলাওঠা।-- শুনা গেল যে উলাগ্রামে প্রাণনাশক গুণধাম ওলাওঠা সংপ্রতি তথায় অবস্থিতি করিয়া অনেককে কাতর করিয়াছেন তাহাকে কাতর করিবার নিমিত্তে কবিরাজসকলে সন্ধান করিতেছেন কিন্তু সে সন্ধান বলবান না হইবাতে ঐ ওলাওঠা ঐ চিকিৎসকদিগকে ঠাট্টা করিতেছে আর যাহার নিকটে ঐ রোগরাজ বিরাজ করিতেছেন তাহাকে ততক্ষণাৎ সন্নিপাত সঙ্গে দিয়া ধর্ম্মরাজের নিকটে পাঠাইতেছেন।



লেখক পরিচিতি
কুলদা রায় ।
গল্পকার। ব্লগার। 
নিউ ইয়র্ক প্রবাসী।


প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : বৃষ্টিচিহ্নিত জল কাঠপাতার ঘর।

Post a Comment

0 Comments