কুলদা রায়ের গল্প : লাদেনের জুতা


জুতা নিয়ে একটা সমস্যায় প্রায়ই পড়তে হয়। জুতার সব কিছুই ভালো। কিন্তু তলিটা ফেটে যায়। আগে ভাগে কিছুই টের পাওয়া যায় না। বৃষ্টি হলেই বোঝা যায়। জল ঢুকে পা ভিজে যায়। শীতকালে আরো সমস্যা। বরফে পা পিছলে যায়। সতর্ক না থাকলে হাড় গোড় ভাঙার আশঙ্কা থাকে। আর তলির ছিদ্র দিয়ে তুষার ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হ্যাচ্ছো হ্যাচ্ছো। ভয়ঙ্কর অবস্থা।

পেলেস থেকে খুব অল্প দামে বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি জুতা কিনে দেখেছি। ছয়মাসের মধ্যেই দুজোড়া ফিনিস। সস্তার জুতার শুধু তলিই ফাটে না। উপরেও ছিঁড়ে যায়। বেশ দাম দিয়ে কিনলেও মেসির জুতাও টেকে না।

দেশে থাকতে জুতা পরার বালাই ছিল না। স্যান্ডেল সু পরলেই কাজের সঙ্গে বাবুয়ানাও চলতো। তাছাড়া মোড়ে মোড়ে ছিল মুচি। সামান্য পয়সা খরচ করলেই নতুন তলি লাগিয়ে দিত। উপরে সেলাই খুলে গেলে সেলাই করে দিত। আর সেলাইয়ে টেকসই না হলে চামড়া দিয়ে তালি করে দিত। নতুন আরেকটি বছর দিব্যি পুরনো জুতাতেই চলে যেত। আমার ঠাকুরদার জুতা জোড়ার বয়স ছিল ঊনচল্লিশ বছর। কোলকাতার চিনে বাজার থেকে কিনেছিলেন। ঠাকুরদা মারা গেলে সম্মান বশত বাবা পরেনি বটে, তবে আমাদের বড়দা মাঝে মাঝে জুতাজুড়ো পায়ে দিয়ে দিব্যি যাত্রাগান শুনে আসতো। জুতাজোড়া এখনো ঘরে আছে। কালিটালি লাগিয়ে দিব্যি পরা যাবে। কেউ না কেউ পরবে।

এই বিদেশটা এমনই পোড়া দেশ যে মুচি পাওয়া যায় না। গেলেও তারা যে মজুরি চায় তা দিয়ে একজোড়া নয়-- নতুন দুজোড়া জুতাই কেনা যায়। ফলে জুতা মানেই নো সেলাই ফেলাই-- সোজা গার্বেজ। ছুটে যাও জুতা কিনতে। ফ্যালো কড়ি। দরকারে দুধ ডিম কেনা ছেটে দাও। এছাড়া আর কী উপায়।

এ ব্যাপারে আমাদের নাইজেরিয়ান সখা চার্লসই বেশ স্মার্টস। তার জুতা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সে দিব্যি নতুন নতুন জুতা পরে আসে। টাকা পয়সা নিয়ে তার ভাবনা নেই।

সেই চার্লসকে ধরতেই সে নিয়ে গেল লং আইল্যান্ড সিটিতে। হান্টারপয়েন্টে। বিরাট স্টোর। নাম গুডলাক। সঙ্গে শফিও এসেছে। সে দীর্ঘদিন ধরে পুরনো একজোড়া জুতা পরে থাকে। সেটা পালটানো দরকার। আমাদের সুপারভাইজার এটা নিয়ে প্রায়ই কথা শোনায়। শফি পালটায় না। বলে, এটা যেসে জুতা নয়। রাজকাপুরী জুতা। এ জুতার তুল্য জুতা পেলেই সে কিনবে।

শফির বাড়ি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। সে ইন্ডিয়ান মুভি আর গানের খুব ভক্ত।

চার্লস তিনজোড় জুতা কিনে ফেলল। আমার পছন্দ হলেও দোকানের সেলসগার্লসকে খুব কায়দা করে শুধালাম, ওয়ি, বনিতা- সুন্দরী, বলতো দেখি, তুমি কি এই স্টোরের জুতা পরে থাকো?

একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে সে বনিতা বলল, নেভার। পরার কোনো হাউস নাই।

কেনো পরো না এই প্রশ্ন করার আগেই সে বলল, একবার সখ করে পরেছিলাম। কিন্তু পরেই মনে হলো-- জুতা পরছি ঠিকই। কিন্তু পা দুটি যেন আমার নয়। অন্য কারো।

‘এমন কেনো মনে হলো?’

‘.এ প্রশ্ন তো আমারও। স্টোরে জুতার ইনভয়েজ পড়ে দেখি, জুতাগুলো আসলে মরা মানুষের। এসেছে বিভিন্ন কবরখানা থেকে। ফ্রি। ফ্রি বলেই জলের দরে পাচ্ছ-- এক ডলার কি দুই ডলারে। এ জুতা পায়ে দিলে ভুত ভর করতে পারে।

চার্লস একথা শুনে বলল, আমরা নাইজেরিয়ার মানুষ। লড়াই করতে করতে চৌদ্ধ পুরুষ ধরে নিজেরাই ভুত হয়ে গেছি। মৃত মানুষ অথবা ভুতপ্রেত আমাদের কাছে ঘেষে না-- তারা আমাদের ভয় পায়। মরা মানুষের জুতা নিয়ে আমাদের কোনো হ্যাপা নেই।

শুনে জুতা কেনা আমার মাথায় উঠল। মনে হলো এই গুডলাক স্টোরে জুতা নয়--হাজার হাজার মৃত মানুষ শুয়ে আছে। তাদের পায়ে এইসব জুতা।

দ্রুত বেগে বের হয়ে এলাম। দেখি শফিও বেরিয়ে এসেছে। হাত খালি। সেও পছন্দ করা জুতা রেখে এসেছে।

আমাদের এই সস্তা জুতা আর কেনা হয় না। শফিকে বলি, দেশে গেলে বাটা কোম্পানীর জুতা কিনে নিয়ে আসব। ছেলেবেলায় বাটার জুতাই পরেছি। বছরের পর একই জুতা। চারপাঁচ বছরেও নষ্ট হয় না। আমরা বড়ো হয়ে গেছি। জুতা বড়ো হয়নি বলে ছোটো ভাই পায়ে দিয়েছে আমার জুতা। বড় ভাইয়ের জুতা পরেছি আমি। কখনো জুতার ছাউনি নষ্ট হলেও তলি কিন্তু এভার গ্রিন। নো ফাটা। নো নষ্ট। একেবারে অক্ষয় কোম্পানীর তৈরি।

দেশে কবে যাবো ঠিক নেই। শফিরও না। শফি দুবছর আগে শাদী করেছে । বিয়ের করতে দেশে যায়নি। এটা নিয়ে মেয়ে পক্ষ ঝামেলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমেরিকান পাত্র বলে আর উচ্চবাচ্য করেনি। সব মেনে নিয়েছে। শফি নিউ ইয়র্কে থেকেই ফোনে বিয়েটা সেরেছে। য়ামাদেরকে বিবির ছবি দেখায় মাঝে মাঝে। বলে, কেমন, দেখতে সুন্দরী না?

শফির বিবি-বেগমের মুখ কালো নেকাব দিয়ে ঢাকা। শুধু চোখ দুটো দেখা যায়। সুর্মা টানা। খুব সুন্দরীই হবে।

আমি মাথা নাড়ি। বলি, হ্যাঁ। খুব সুন্দরীই।

শফি বলে,আলহাম দুলিল্লাহ। সবই খোদার মর্জি। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, জানো রায়, আব্বাজান যখন শাদীর পয়গাম আনতে শুরু করলেন, তখন তাকে সাফ সাফ বলে দিলাম-- দুলহান যেন কারিনার মতো হয়। কারিনার মতো ছাড়া অন্য কাউকে শাদীই করব না।

শফির আব্বাজান জিজ্ঞেস করলেন, কারিনা কে হে বেটা?

শফি একটু সলজ্জ হয়ে বলল, হিরোইন। সিনেমার হিরোইন আব্বুজি।

--সে কি নূর জাহানের নাতি লাগে?

--না। না। মুম্বাই কা হিরোইন। কারিনা কাপুর।

শুনে শফির বাপজান গম্ভীর হয়ে রইলেন কিছু সময়। বাপজি, ইন্ডিয়ান ক্যান, আমাদের জেবা বেগমের মতো দুলহান খুঁজি। তিনি পাকিস্তানের হিট হিরোইন ছিলেন। আরমান সিনেমা দেখে আমাদের কালের পোলাপানের পাগল পাগল দশা।

শফি উত্তর দিল--না।

--তাইলে জিনাত আমানের লাহান? ইন্ডিয়ান হইলেও তো জিনাতজি মুসলমান। জিনাতজির মতো কাউরে শাদী করলে আমাগো ইমান আকিদা রক্ষা হবে। বাপজান, না করিস না। রাজী হ।

শফি নিউ ইয়র্ক থেকে ইসলামাবাদে ফোন কানে করা তার আব্বাজীকে একটু চড়া গলায় জানিয়ে দিল--কারিনা কাপুর মুসলমান হলে তারেই সত্যি সত্যি বিয়ে করার চেষ্টা করত। কারিনাই তার ফার্স্ট লাভ--লাস্ট লাভও বটে। তার তুল্য অন্য কোনো মেয়েকে তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়। আব্বাজানের জেনে খুশি হওয়ারই কথা যে, সে কারিনার মতো একজন মুসলমান মেয়েকেই শাদী করতে চেয়েছে। কোনো হিন্দুকে নয়।

শফি খুব বেশি চাপ নিতে পারে না। চাপ নিলে শফির মাথা আউলা হয়ে যেতে পারে। এটা শফির আব্বা জানে। একটু ম্যাড়মেড়ে গলায় বলে, তাই সই বেটা।

এটা 2001 সালের কথা। শফির আব্বাজান অনেক খুঁজে কারিনা কাপুরের মতো একজন দুলহানকে খুঁজে বের করেছে। শফি দেশে যাবে না বলে ফোনে তার সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থাও করেছে। দুলহান তখনো নাবালিগ। বালিগ হতে আরো প্রায় দু বছর লাগবে। তখন শফি তাকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসবে। শফি বিবি-বেগমকে একটা আইফোন কিনে পাঠিয়েছে। নিজেরটা স্মার্ট ফোন। সেই ফোনে প্রতিদিনই তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে। আর ফাঁকে ফাঁকে কারিনা কাপুরের সিনেমা দেখে। পুরাই ফিদা।

শফির প্রিয় সিনেমা কভি খুশি কভি গাম। প্রায়ই ইউটিউবে সেটা চালায়। কাজলের বোনের চরিত্রে কারিনা অভিনয় করেছে। নাম পূজা। লন্ডনের কিংস কলেজে পড়ছে। অতি সুন্দরী। আলট্রা মডার্ন। ঋত্বিক রোশনকে মুগ্ধ করার জন্য অনেকের সঙ্গে নেচে নেচে গাইছে-- দেওয়ানে হ্যায় দেখো বেকারার হো/সামহালো সামহালো না পেয়ার হো। (তার দশা পাগল পাগল। খবরদার তার প্রেমে পড়ো না।)

কারিনার সব আয়োজনই যখন ব্যর্থ হয়েছে, ঋত্বিক তার ডাকে সাড়াও দিচ্ছে না, কারিনার মন খারাপের দশা-- ঠিক তখনি ঋত্বিক রোশন কারিনার দিকে ফিরে গেয়ে ওঠে--আঁখো মে ডুব জানে কো/হাম বেকারার বেইঠে হো। (তোমার চোখের মধ্যে ডুব দিয়ে অস্থির হয়ে গেছি-- সবকিছুই হারিয়ে গেছে সেই ক্ষণে।আমি অপেক্ষা করছি আমার সেই সখীর জন্য/ বহু বছর ধরে সেই একটি মুখই আমি খুঁজে চলেছি। সে আমার হৃদয় জুড়ে আছে।)

শফি বলে, যখন ঋত্বিক গেয়ে উঠেছে সেই ‘লাইনটি-- আঁখো মে ডুব জানে কো’, ঋত্বিকের পরনে হলুদ সোয়েটার। আর কারিনার বুকে হলুদ কাঁচুলি। হাতে একটি হলুদ ফুল চিবুকের নিচে ধরে রেখেছে। তখন কারিনার চোখে মৃদু মুগ্ধতা ফুটে উঠেছে। এই দৃশ্যটির কারিনাকে দেখে আমি প্রেমে পড়ে গেলাম। আমার জীবনে লেখা হয়ে গেল কারিনার জন্য প্রেমগীত। এই কারিনাই আমাকে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছিল।

--সে ঘটনাটি কী? খুব আগ্রহ ভরে শুধালাম।

শফি একটু চুপ করে রইল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এখন নয়। পরে কখনো বলব।

কারিনার জন্য শফি নিজেকে ইন্ডিয়ান বানিয়ে ফেলেছে। তার মুখে দাড়ি নেই। ক্লিন শেভড। সালোয়ার কামিজও তাকে পরতে দেখা যায় না। তার বন্ধুদের মধ্যে কোনো পাকিস্তানী নেই। ইন্ডিয়ান লোকদের সঙ্গেই সেমেলামেশা করে। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে মুসলমান। ধর্মের কথা বললেই সে চুপ করে সরে পড়ে। সে বলে তার ধর্ম কারিনাপ্রেম।

এই নিয়ে জ্যামাইকান কলিগ ফিওনা বেশ মজা করে। তার সামনে নেচে নেচে গেয়ে বলে, কারিনা কি আমার চেয়েও সুন্দরী।

শফি হেসে ফিওনার সঙ্গে পা মিলিয়ে বলে, তুমিও সুন্দরী। তবে কিনা কারিনা-- কারিনাই।

জুলিয়েট নামের কলাম্বিয়ান মেয়েটি ইউটিউব সার্চ করে কারিনা কাপুরের গান খুঁজে বের করে গেয়ে ওঠে, বলে চুরিয়া, লাইজা লাইজা।

মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে শফি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে যায়। মাঝভাতও খায়। রুই মাছের ঝোল তার খুব প্রিয়। একদিন বলে বসল, বিবি এলে তাকে ইলিশ মাছ খাওয়াবে।

শফির এই ভাব দেখে আমাদের সিনিয়র কলিগ আকন ভাই জানান, শফির এই বেশ আগে ছিল না। আগে তার মুখে দাড়ি ছিল। চোখে সুরমাও লাগাত। সালোয়ার। কামিজ ছাড়া কখনো শার্ট প্যান্ট পরতে দেখেনি।

আকনভাই এদেশে অনেক আগে এলেও তার গতিপ্রক্ররতি বোঝা ভার। তিনি নিয়মিত নামাজ কালাম পড়েন। ইন্ডিয়ারে পছন্দ করেন না। কিন্তু পাকিস্তানের নাম এলেই কশে গালি দেন। বলেন, দুনিয়ার সবাইরে বিশ্বাস করলেও পাকিদের কক্ষনো নয়। এরা বজ্জাতের হাড্ডি। ফলে শফির ব্যাপারে আকন ভাইয়ের কথাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। আবার আকনভাইকে বাদও দিতে পারি না। বেচারার একটা নরম হৃদয় আছে। মানুষের বিপদে জানপরান দিয়ে লড়েন।

আর একদিন জ্যাকশন হাইটসের হাটবাজার রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে আকনভাই জানালেন, শফি তখন নতুন এসেছে। কাজ করে একটি রেস্টুরেন্টের ডেলিভারি ম্যান হিসেবে। ম্যানহাটনের রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে বাসায় বাসায় খাবার পৌঁছে দেয়। বেতন কম। কিন্তু ভালো টিপস পায়। নতুন হিসেবে শফির আয়রোজগার কম নয়। তরুণ বয়স। মুসলিম কমিউনিটিতে ঘুরে বেড়ায়। অন্য কমিউনিটির সঙ্গে বিশেষ মেশে না। হালাল খাবার ছাড়া খায় না। বলে থামলেন আকন ভাই। জামার খুঁট দিয়ে চশমার কাচ পরিস্কার করলেন।

আমাদের ম্যানহাটনে কাজ ছিল। আকনভাই আর আমি খেয়েদেয়ে ই-ট্রেন ধরি। ট্যুইন টাওয়ারের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আকনভাই কানের কাছে ফিসফিস করে জানালেন, সেদিন নভেম্বর মাস। এগারো তারিখ। ভোর বেলা। ঝকঝকে রোদ উঠেছে। সাউথ ফেরির কাছে ফুডকার্ট খুলে বসেছি। হঠাৎ শুনতে পেলাম বিকট শব্দ। তাকিয়ে দেখি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ট্যুইন টাওয়ারে কালো ধোঁয়া। আগুন জ্বলছে। কাটা কলাগাছের মতো টাওয়ার দুটি ধ্বসে পড়ছে।

সবে তখন অফিস আওয়ার শুরু হয়েছে। লোকজন গিজগিজ করছে। তাদের আর্তনাদে বিস্ফোরণের শব্দ চাপা পড়ে গেছে। বলতে বলতে আকনভাই স্তদ্ধ হয়ে গেলেন। মুখে কোনো কথা নেই। হুশহুশ করে এয়ার ট্রেন যায়। শীতল হাওয়া আমাদের কানের কাছে বইতে থাকে। আকন ভাইয়ের শীত শীত লাগে। ব্যাগ থেকে টুপি বের করে মাথায় দেন। বলেন, ধুলোবালিতে চারিদিক ঢেকে গেছে। ততক্ষণে রাস্তায় এম্বুলেন্স, ফায়ার ডিপার্মেন্ট আর পুলিশের গাড়ি সাইরেন্স বাজাতে বাজাতে আসছে যাচ্ছে। লোকজন যে যেভাবে পারছে বাড়ির দিকে ছুটছে। তাদের চোখেমুখে মহা-আতঙ্ক। কারো কোনো হুঁশ নেই। কে বা কারা চিৎকার করে বলছে, লাদেন বোমা মারছে। লাদেন বোমা মারছে।

কোনভাবে টাইমস্কয়ারে পৌঁছে দেখি, ফুডকার্টগুলো একাকি পড়ে আছে। সেলাররা নেই। দেওয়াল ঘেষে কে একজন পড়ে আছে ভয়ার্ত পশুর মতো। থরথর করে কাঁপছে চোখ বুজে। মুখে কোনো কথা নেই। আমাকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে ধরেছে। চিনতে পারলাম, এ হলো পাকিস্তানী শফি। ফুড ডেলিভারির অবসরে আমাদের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে।

জীবন বাঁচানো তখন ফরজ। তাকে ঠেলে সরাতে যাই। কিন্তু সে আরো জোরে আকড়ে ধরে। মুখে বলে, নেহি নেহি। এখনি এখান থেকে সরে পড়া দরকার। আগুনের হল্কা, ধোঁয়ার মধ্যে ছাই আর কংক্রিট ছিটকে ধ্বসে পড়ছে। চেয়ে দেখি শফি অচেতন। আর কিছুক্ষণ থাকলে এখানে ধুলাবালিতে চাপা পড়তে হবে।

হঠাৎ করে চেয়ে দেখি আমাদের পাশ দেখে একজন লোক ছুটতে ছুটতে এসে পড়ে গেল। লোকটার গা থেকে রক্ত ঝরছে। তার হাতে একটা মোবাইল। তাতে গান বাজছে, বলে চুরিয়া। লইজ্জা লইজ্জা।

এই হট্টগোলের মধ্যেও সুরটি শুনতে পাচ্ছি। শফির কানেও পৌঁছেছে।শুনে শফি চোখ খুলল। অবাক হয়ে দেখতে পেল, তার চোখের সামনে একটি মেয়ে ঝুঁকে আছে। বলছে, উঠে দাঁড়াও। আমারে ধরো। ধরে ওঠো।

এই হাস্যময়ী, লাস্যময়ী, সুন্দরী মেয়েটির হাত ধরল শফি। উঠে দাঁড়ালো। এই ধ্বংস আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শফি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চলল। মেয়েটির হাত ধরে সেও যেন গাইতে লাগল-- বলে চুরিয়া গানটি।

হাতটি কোনো মেয়ের নয়-- আমার। আকনভাই খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন।

হাতটি কোনো মেয়ের কি আকন ভাইয়ের সেটা বিষয় নয়। শফি হাতটি ধরে অনেক সময় ব্যয় করে আকন ভাইয়ের বাসায় পৌঁছাল।

আকন ভাইয়ের পরিবার দেশে থাকে। তাদেরকে মার্কিন দেশে আনেননি। জ্যাকসন হাইটসে কয়েকজন বাংলাদেশিকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় ম্যাচ করে থাকে। শফিকে তিনি ছেড়ে দিলেন না। সোজা বেজমেন্টে ঢুকিয়ে দিলেন।

পরিস্থিতি তখন খারাপ। বাইরে যেতে বাড়িওয়ালা বুড়ি না করেছে। বলেছে, বাপুরা, তোমরা পারলে দাড়িটাড়ি কেটে ফেলো। আর ঘর থেকে পবিত্রগ্রন্থ থাকলে সেটা লুকিয়ে ফেলো। ঘরে বসে প্রেয়ার করো। বলেই থামলো না। একটা বড়োসড়ো ক্রুশচিহ্ন দরজায় সেটে দিল।

আকনভাই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ভাইরে, এ জীবনে এই দশায় পড়ছিলাম একাত্তর সালে। তখনপাকমিলিটারি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। হিন্দু পেলেই ঠুস। বাইরে বেরোনোর উপায় নাই। হিন্দুপাড়ার অনিলদাদা গুলির মুখে মরতে মরতে বেঁচে গেছে। আমাদের ঘরের মধ্যে পালিয়ে আছে। ভয়ে আধমরা। আমরাও বাইরে যেতে পারি না। পাকিদের দোসর রাজাকাররা ঘোরাফেরা করে। তারা ভয়ঙ্কর। সামনে পড়লে রক্ষা নেই। কলে পড়া ইঁদুরের মতো দশা।

তারপর বিড়বিড় করে আকনভাই বললেন,এ জগতে হিন্দু হইলেও রেহাই নাই। মোসলমান হইলেও রেহাই নাই। একেক দেশে একেক পদের মানুষ বিপদে আছে।

এই বিপদের মধ্যে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থেকে আকনভাইরা মনে মনে সুরা ইয়াসিন পড়ে। আর পকেটে রাখে ছোট্ট বাইবেল।

এদিকে শফির কোনো সাড়া নেই। তার খোঁজ নিতে গিয়ে আকনভাই দেখতে পেলেন বেজমেন্টের স্টোর রুমের এক কোণায় থরথর করে কাঁপছে। চোখ বন্ধ। খাওয়া নেই। নাওয়া নেই। আকনভাইয়ের সাড়া পেয়ে শফি তার পায়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি মারি নাই। আমি বোমা মারি নাই।

হেচকি তুলতে তুলতে শফির অজ্ঞান হওয়ার দশা। শফিকে কোনো ভাবেই থামানো যায় না।

তখন আকন ভাই শফির কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচিয়ে বলল, কারিনা কাপুর রওনা হইছে। যেকোনো দিন নিউ ইয়র্কে আসবে।

শফির কাঁপাকাপি থেমে গেল। চোখ মেলল না। ফিসফিস করে জানতে চাইল, কে?

আকন ভাই জবাব দিলেন, কারিনা। কারিনা কাপুর আসবে।

শফির কাঁপুনি থেমেছে। কিন্তু চোখ খোলে না। চোখ বন্ধ রেখেই বলে, কারিনা কাপুর কে?

--কেনো, মনে নাই? আকন ভাই শফির কানের কাছে মুখটি এনে বলেন, সেই ট্যুইন টাওয়ার যেদিন ভেঙে পড়ল, সেদিন তোরে যে মেয়েটি হাত ধরে উঠায় আনল। নইলে তো সেদিন গেছিলি। সেই-ই কারিনা। তোরে দেখতে আসবে। বলে আকন ভাই ছোট্ট করে গেয়ে শোনালেন—বোলে চুরিয়া। লাইজা লাইজা।

এবারে চোখ মেলল শফি। পিটপিট করে শুধালো, সত্যি আসবে?

--না আইসা যায় কই। তার তো ইশকের মামলা। তোর বিহনে তার বাঁচা দায়।

বলে আকনভাই একটুকরো প্যানকেক তার দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, কারিনা কাপুর তোমার লাইগা পাঠায় দিছে। খাইয়া লও। গায় গতরে জেল্লা বাড়াও।

শফি অদ্ভুত এক ঘোরলাগা চোখে কেকের দিকে তাকাল। তারপর আকন ভাইয়ের দিকেও চাইল। আকনভাই মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। বললেন, কারিনা কাপুরের প্যানকেক। নো লেট।

শফি তবু উঠল না। আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল।

তাকে ওঠাতে না পেরে আকনভাই বিড়বিড় করে কষে দুটো গালি দিল, শালা পাইক্কা। ট্যুইন টাওয়ারের কাছ থেকে না তুলে আনলে তো মরেই যাইতি। এখন যা অবস্থা তাতে বাইরে বের হইয়াই কঠিন। কে যে কখন কী করে বসে ঠিক নেই। এখন আবার খাওয়া নিয়ে হ্যাপা দিচ্ছিস।

আকন ভাই বেজমেন্ট থেকে চলে গেল।

শফি প্যানকেকটি খেতে গিয়েও খেলো না। তার মাথার মধ্যে ট্যুইন টাওয়ারের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার শব্দ, অসংখ্য মানুষের মরণ চিৎকার রা রা রা করছে।মনে হলো এই আহত-নিহত লোকগুলো তাকে দেখিয়ে বলছে, এই লোকটা—এই লোকটাই ট্যুইন টাওয়ারে আঘাত করেছে। তার গলা শুকিয়ে এলো। ঢক ঢক করে পানি খেলো। মনে হলো তার আর রক্ষা নেই। তাকে যে কেউই মেরে ফেলবে। এর থেকে বাঁচতে হলে কারিনা কাপুরকেই দরকার। মরিয়া হয়ে বেজমেন্ট থেকে আকন ভাইয়ের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কখন আসছে কারিনা?

--যে কোনো দিন। যে কোনো সময়ে। আকন ভাই ফার্স্ট ফ্লোর থেকে উত্তর দিলেন, দেওয়ানা হয়ে পড়ছে মাইয়াটা। রেডি থাকো।

বেসমেন্টে একটা টিভি সেট আছে। যাওয়ার সময় স্টিভিটা অন করে দিয়ে গেছেন আকন ভাই। শফি চোখ খুলে দেখতে পেলো, টিভি ঝির ঝির করে। কোনো ছবি নেই। খুব ভালো করে দেখে বুঝল ছবির মধ্যে মুখের একটু আদল আছে বটে কিন্তু সে মুখে কোনো কথা নেই। পুরোপুরি মিউট।

শফি চোখ রগড়ে নিলো। তার মনে হলো, মুখটি কারিনা কাপুরেরই হবে। কারিনা ছাড়া আর কেইবা আসতে পারে এই বেসমেন্টে—তার কাছে!

কারিনাকে দেখে শফির মুখ উজ্জ্বল হলো। তবে কারিনার মুখটি মোটেই উজ্জ্বল নয়। ম্লান। কালো। মুখ কালো দেখে শফির সে হাসিটায় ছেদ পড়ল। বিড়বিড় করে বলল, রাগ কইরা আছ ক্যানো?

--তোমার লাইগ্যা। রিন রিন করে কারিনা জবাব দিল। বলল, তুমি এই অন্ধকারে বইসা পলায় রইছ। খাওন দাওন করছ না। গায়ে তাগত নাই। এই রকম ম্যান্দামারা নায়কের লগে দেখা করি কী করে?

--আমার ভয় করে। হাহাকার করে উঠল শফি। বলল, মনে হয়, ট্যুইন টাওয়ার ভাঙার দায়ে লোকজন আমারে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

কারিনা হেসে বলল, তুমি ভাঙো নাই। লাদেন ভাঙছে।

--লাদেন কেডা?

--লাদেন হলো গে টেররিস্ট। সৌদি আরবে বাড়ি। থাকে আফগানিস্তানে। টিভিতে বলছে। তোমার কথা বলে নাই।

শুনে শফির মনটা তাজা হলো। বলল, আমার কোনো দোষ নাই তাইলে?

--না। তুমি নির্দোষী। কারিনা বলল, তুমি খাওয়া দাওয়া করো। তাগদ বাড়াও তারপর আমার লগে নাচতে বেরোও।

এরপর আর কথা নেই। শফি শিশুর মতো সামান্য একটু হাসে। তারপর খাওয়ার জন্য মুখটি বাড়িয়ে দেয়। কারিনা কাপুর তাকে অতি যত্নে প্যানকেকটুকু খাইয়ে দেয়। তাকে জল খাওয়ায়। ওড়নার দিয়ে মুখটি মুছিয়ে দেয়। বলে, এইতো লক্ষ্মী সোনা আমার। নিজের চোখ থেকে কাজল নিয়ে শফির কপালের ডানদিকে একটা ফোঁটা এঁকে দেয়। বলে, ভয়ডর সব দূরে যা।

শফির হাত ধরে ওঠাতে যাবে, তখন কারিনা দেখতে পেল শফির পায়ে কোনো জুতা নেই। ঘরেও কোনো জুতা খুঁজে পাওয়া গেল না। শফি এবার মনে করতে পারল, ট্যুইনটাওয়ারে ধ্বসে পড়তে দেখে যখন সে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছিল তখন তার পা থেকে জুতাজোড়া কোথাও পড়ে গেছে। শফির পা তখনো পোড়া ছাই আর ধুলো মাখা।

কারিনা কাপুর চোখের জল দিয়ে শফির পা ধুয়ে দিল। নিজের চুল দিয়ে পায়ের ছাই আর ধুলো মুছে দিল। তারপর হাওয়া থেকে একজোড়া জুতা বের করে আনল। বলল, এই জুতা জোড়া শী৪২০ সিনেমায় পরেছিলেন। শফির পায়ে সেই জুতা জোড়া পরিয়ে দিতে দিতে গুণ গুণ করে গাইল, মেরা জুতা হ্যায় জাপানি/এ পাৎলুন ইংলিশস্তানি…

শফি খাওয়া দাওয়া করে কয়েকদিনের মধ্যে তাগদ বাড়িয়ে ফেলল। তারপর একদিন সে কাউকে কিছু না বলে বেজমেন্ট ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। কোথায় গেল জানা যায় না। একটা চিরকুট রেখে গেল।

শফি লিখেছে--

কারিনা কাপুরের সঙ্গে চললাম। জীবন সুন্দর।

এই গল্প সত্যি হওয়া কঠিন। মশকরা করেই হয়তো আকনভাই শফির নামে এই গল্পটি বানিয়ে বলছেন। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করে দেখি আকন ভাইয়ের গলায় কোনো ঠাট্টা বা শ্লেষের সুর নেই। যেভাবে মানুষ সত্যি করে বলে ঠিক তিনি সেভাবেই অন্তর দিয়েই যেন কারিনা কাপুর আর শফির জুতার ঘটনাটি বললেন। এভাবে যেকোনো জ্বলজ্যান্ত মিথ্যেও মহৎ সত্যি হয়ে ওঠে।

আকন ভাই একটি চিরকুট বের করে আনলেন তার ডাইরির ভেতর থেকে। হাতে নিয়ে দেখি, বেশ পুরনো। আঁকা বাঁকা ইংরেজিতে লেখা। সেটা কোনো কলম বা পেন্সিল দিয়ে লেখা নয়। চোখের কাজল দিয়ে লেখা। আর সেই লেখা থেকে জুই ফুলের সুঘ্রাণ ভেসে আসছে।

-- এরপর শফির দেখা পেলেন কী করে? জানতে চাইলাম আকন ভাইয়ের কাছে।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তখন ধীরে ধীরে নিউ ইয়র্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে। ম্যাডিসন স্কোয়ারে মানুষকে সাহস যোগানোর জন্য কনসার্ট হচ্ছে। পিচ মিছিল হচ্ছে। আতঙ্কগ্রস্থ মানুষদের জন্য সাইকোথেরাপির গণব্যবস্থা হয়েছে। বুশ সাহেব লাদেনকে ধরার জন্য আফগানিস্তানে আক্রমণ করেছেন। এর মধ্যে একদিন কুইন্স হাসপাতালের মেন্টাল হেলথ ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে ফোন করে জানালো, আমার ভাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি একটু অবাক হলাম। আকন ভাই জানালেন। আমার কোনো ভাই এই মার্কিন দেশে নেই। তাহলে কোন ভাইয়ের কথা বলল ওরা!

হাসপাতালে গিয়ে দেখি, শফি। শফি অপেক্ষা করছে। মুখে কোনো কথা নেই। চুপঁচাপ বসে আছে চেয়ারে। থেরাপিস্ট বললেন, ছয় মাস মেন্টাল রিহ্যাবে ছিল। এখন সুস্থ। বাসায় নিয়ে যান।

বেচারার মুখ দেখে না করতে পারলাম না। দিনকাল খারাপ। আমাদের সবার একই দশা। ওকে ছেড়ে দিলে কী হয় কে জানে। দিন কয়েক পরে ওর আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে তাদের কাছে হাওলা করে দেবো।

আকনভাইয়ের বাসায় স্বাভাবিক হয়ে আছে শফি। নিয়মিত ওষুধপত্র খায়। মাসে মাসে সাইকোথেরাপির জন্য কুইন্স হাসপাতালে যায়। কিন্তু পাকিস্তানী লোকদের কাছে আর যায় না। বা কারিনা কাপুরকে নিয়ে কোনো হ্যালুসিনেশন দেখে না। হোমলেস শেল্টারে চাকরিতে ঢুকে পড়ল আমাদের সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে মেলেমেশে। আমাদের খালেস দোস্ত হয়ে থাকে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো হিন্দি সিনেমা দেখি। আমরা তার গান করি। শফি ইংরেজিতে তার তর্জমা করে শোনায়।

আকন ভাই লোকটার মেজাজ মর্জি বোঝা ভার। এই ভালো। এই মন্দ। মুখের আগল নেই। মাঝে মাঝে পাইক্যা বলে গালি দেয় শফিকে। শফি কিছু বলে না। হ্যা হ্যা করে হাসে। তার মেজাজ মর্জি অতি ঠাণ্ডা। কোনো উত্তেজনা নেই। রাগ নেই। ক্ষোভ নেই। কোনো খারাপ স্বভাব নেই। আকন ভাইয়ের গালি শুনে বলে, একাত্তরে আমার জন্মই হয় নাই। সেকালে পাকিস্তান তোমাদের সঙ্গে কী করেছে আমার জানা নাই। আমার দেশের কেউ বলেও নাই। তার দায় আমি নেবো কেনো?

সোজা কথা শফির। সে আমাদের সঙ্গেই আকন ভাইয়ের বাসায় ঢোকে। খায় দায় ঘুমায়। মাঝে মাঝে কদু-চিকেন রাঁধে।

এই শফির মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিল। তার বিবি বালেগ হয়েছে। নিউ ইয়র্কে আসার তার সময় হয়েছে। শফি আমাদেরকে নিয়ে বাসা ভাড়া করার জন্য তোড়জোড় লাগিয়ে দিল। তার ইচ্ছে আমাদের কাছেই বাসা নেবে। কিন্তু আকন ভাই কী যেন চিন্তা করে তার জন্য ফ্লাশিং এলাকায় বাসা ঠিক করে ফেললেন। বললেন, পাইক্যা শালার বিবি কি আর আমাগো সহ্য করবে! এখন তার ভাই বেয়াদরদের খুঁজে নিক। এগো বিশ্বাস নাই।

শুরুতে শফির মন খারাপ হলেও শফি অচিরেই ফ্লাট সাজাতে শুরু করল। দেখে শুনে বেশ দামী ফার্নিচার কিনল। মেঝেতে দিল কার্পেট। মেসি মার্কেট প্লেস থেকে কিনতে শুরু করল নতুন বিবির জন্য কাপড়চোপড়। সবই কারিনা কাপুর স্ট্যাইলের। কিন্তু কোনো হিজাব বা বোরখা কিনতে দেখা গেল না। এর মধ্যে শফি বেশ কিছু রান্নাওও শিখে ফেলল। তার ইচ্ছে, বিবিকে রান্না করতে দেবে না। বরং খোঁজ খবর নিতে লাগল ইন্ডিয়ান নাচ ও গানের স্কুলের। মৃদু হেসে বলল, নাচ গান শিখলে বিবিটি সত্যি সত্যি কারিনা হয়ে উঠবে। বলল, প্রতি উইকেন্ডেই তার ফ্লাটে শফি কারিনা কাপুরের মাহফিলের আয়োজন করবে। ব্যাপক খানাপিনার ব্যবস্থা হবে। তার বিবি নেচে গেয়ে শোনাবে।

আকন ভাই জানালেন সবাই গেলেও তিনি সেখানে যাবেন না। শফি তাকে অনেক অনুনয় বিনয় করতে লাগল। বলল, যদি আকন ভাই তার ফ্লাটে মাহফিলে না যায় তবে আকন ভাইয়ের বাসায়ই বিবিকে নিয়ে আসবে। দরজায় খিল তুলে দিয়ে তার বিবি মাহফিলটি করবে। বিবির সেই কারিনা রূপ দেখে নিশ্চয়ই আকন ভাইয়ের অভিমান ভাঙবে। এরপর থেকে শফির ফ্লাটে যেতে তার আপত্তি থাকবে না।

সাজুনিগুজুনি কেনার অভিজ্ঞতা আমাদের কারোরই নেই। সেজন্য শফি ধরল আমাদের কলিগ ফিউনাকে। ফিউনা জ্যামাইকান মেয়ে। সে এক বোতল কনিয়াকের বিনিময়ে শফির সঙ্গে সাফুরা স্টোরে গেল। বগলদাবা করে নিয়ে এলো কয়েকটা মেকাপ বক্স। বেশ দামী কিছু শর্ট প্যান্ট আর টি শার্টও কিনে দিল শফিকে। শফি লজ্জা পেয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল। ফিউনা মেয়েটি হেসে তার মুখে একটা চুমু খেয়ে জানাল, সে ইন্ডিয়ান মুভিতে দেখেছে--মেয়েরা শর্ট প্যান্ট পরে। কারিনাও পরে নিশ্চয়ই। ফলে শফি আর না করতে পারল না। তবে আমাদের কানে কানে বলল, এগুলো হয়তো বিবি পরতে চাইবে না। প্রথম প্রথম ঘরে মধ্যে পরবে। শেষে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বাইরেও শর্ট শার্ট প্যান্ট পরে বেরুবে নিশ্চয়ই। শুনে ফিউনা বলল, ডরো মাৎ শফি, সামারে তোর বিবিকে সীবিচে নিয়ে যাবি। তারজন্য ফিউনাই দুইসেট বিকিনি উপহার দেবে।

ফিউনা ইউটিউব থেকে হিন্দি মুভি তাশান বের করল। কারিনা সমুদ্র থেকে সবুজ রঙের বিকিনি পরে উঠে আসছে। তারপরে একটা বোটের উপরে নাচছে--

চালিয়া চালিয়া চালিয়া

রুহ চুরালো মে হু এইসি চালিয়া–


ফিউনা সেই ঢংয়ে শফির সামনে নেচেও দেখালো। দেখে শফির মুখ লাল হয়ে উঠল।

এই লাল আর থামেনি। যেদিন প্লেনে ওঠার কথা সেদিন শফি এতো বেশি লাল হয়ে উঠল যে,ওর ঘন ঘন শ্বাস উঠতে লাগল।শেষে ওকে আবার সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে নেওয়া লাগল। তিনি সব পরীক্ষা টরিক্ষা করে আবার ওষুধপত্র দিলেন। বললেন, শফির পাকিস্তান যাওয়ার দরকার নেই। এখানেই থাকুক। ওর বিবিকে অন্য কেউ নিয়ে আসুক।

তাই হলো। শফির বিবি জেএফকে এয়ারপোর্টে নামল। মেয়েটিকে নিয়ে এলেন মেয়েটির দূর সম্পর্কের মামু--আশরাফ। তিনি পাক আর্মির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। কবছর হলো তিনি তার মেয়ের সুবাদে নিউ ইয়র্কে থাকেন। দেশে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

তিনি এয়ারপোর্ট থেকে সোজা শফির বাসায় পৌঁছে দিলেন। শফির বিবিকে দেখা হলো না আমাদের।

বিবি আসা উপলক্ষে শফি সপ্তাহখানেক ছুটি কাটাল। অফিসে ফিরে এলো হাসি হাসি মুখে। বলল, জীবন সত্যিই সুন্দর। আগে বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারলে অনেক আগেই বিয়ে করে ফেলত। আর বিবি ছিবির চেয়েও বাস্তবে বেশি সুন্দর।

এর মধ্যে একটা ঝামেলা হয়ে গেল। সেদিন সবে আমাদের অফিস শুরু হয়েছে। বিকেলের শিফট। এর মধ্যে আমাদের সুপারভাইজার জোসেফ সবাইকে তার রুমে ডেকে আনল। বলল, টিভিতে চোখ রাখো। লাদেনকে ধরা হয়েছে।

ফক্স নিউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা জানাচ্ছেন বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড টেররিস্ট আল কায়েদার প্রধান ট্যুইন টাওয়ার ধ্বংসের নির্দেশদাতা ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানের আবেটাবাদের একটি বাড়িতে খুঁজে পেয়ে শিলবাহিনী হত্যা করেছে।

পুরো কিলিং মিশনটির ফুটেজ দেখানো হচ্ছে। অতি সহজেই বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গীটি মার্কিন নৌবাহিনীর ‘সীল’ দলের ২৩জন কমান্ডোর হাতে নিহত হলো।

জোসেফ নাইজেরিয়া থেকে এক সময়ে মার্কিন দেশে রিফুজি হিসেবে এসেছিল। এখন এদেশের নাগরিক। খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ। নাইন ইলেভেনের সকালে ট্যুইন টাওয়ার লাদেনের নির্দেশে ধ্বংশ করা হলে জোসেফের ভাই নিহত হয়েছিল।

লাদেনের নিহত হওয়ার খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোসেফ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সবার সামনে চোখের ফেলতে ফেলতে বলল, আমার ভাই কখনো কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলেনি। কারো কোনো ক্ষতি করেনি। আফগানিস্তানে হামলা করতে মার্কিন বাহিনীকে পাঠায়নি। তাকে কেনো মরতে হলো? কী দোষ করেছিল?

লাদেনের ডেডবডি গভীর সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে জোসেফ উল্লাশে ফেটে পড়ল। এক বোতল শ্যাম্পেন খুলে ফেলল। নেচে নেচে লাদেনের মৃত্যু উদযাপন করতে লাগল।

শফির কাঁধে হাত দিয়ে জোসেফ লাফাতে লাফাতে বলল, নাচো, শফি নাচো। তোমার লোকদের টেররিস্টদের কাছ থেকে সরে আসতে বলো।

শফি কিছু বলল না। মুখ কালো করে জোসেফের কাছ থেকে সরে এলো। আমাকে বলল, শোনো রায়, এই লাদেনকে তৈরি করেছে এই দেশ। এখন সেই লাদেন এই দেশের শত্রু। এটা রাজণিতি। তার দায় আমার লোকজনের ঘাড়ে চাপানো অন্যায়।

তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, লাদেন আসলে অনেক আগেই মরে গেছে। কিন্তু তাকে জীবিত বলে ইন্দুরবিড়াল খেলা হয়। এটা ক্ষমতার খেলা। ব্যবসার খেলা। এ খেলার তো শেষ নাই। মাঝখান থেকে নিরীহ লোকজন ঝামেলায় পড়ে।

শফি এরপর কয়েকদিন অফিসে এলো না। তার বিবি আসা উপলক্ষে কোনো মাহফিলেরও আয়োজন করল না। ফিউনা একটু অবাক হয়ে বলল, ব্যাপার তো বেশ সিরিয়াস মনে হচ্ছে। শফি দেখছি লাদেনের বিরহে রীতিমত সিক হয়ে পড়েছে। পার্টির কোনো খবর নাই। আমার মাগনা টাকিলা মাঠে মারা গেল।

শফির খোঁজ নিতে তার বাড়িতে গেলাম। একজন বয়স্ক লোক দরজা খুললেন। ভেতর ঘর থেকে শফি লিভিং রুমে এলো। একটু অস্বাভাবিক মনে হলো। চোখমুখ কিছুটা উদ্ভ্রান্ত। মুখে উস্কো খুস্কো দাড়ি। শফি জানালো, তার বিবির সঙ্গে তার সম্পর্কটা চমৎকার। সেদিন তার বিবিকে নিয়ে কুইন্স মলে গিয়েছিল। ফিরতে ফিরতে একটু সন্ধে হলো। তার বিবি হিজাবপরা। বিবির বাড়ির লোকজন হিজাব পরতেই অভ্যস্ত। শফিরা মল থেকে বেরুতেই রাস্তার উল্টো পাশ থেকে কয়েকজন লোক তাদের দিকে ভয়ংকরভাবে তাকালো। তারপর সমস্বরে তাদের দিকে তাকিয়ে চেঁচাতে লাগল, লাদেন লাদেন। শফি বলল, তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমাদেরকে লক্ষ করে বলতে লাগল, টেররিস্ট। টেররিস্ট।

মনে হলো তারা আমাদের আক্রমণ করতে পারে। কাছাকাছি কোনো পুলিশও ছিল না। আর পুলিশকে কল করার সুযোগও ছিল না। কপাল ভালো এর মধ্যে একটা ট্যাক্সি ক্যাব এসে পড়ল। তাতে ঝটপট উঠে বাসায় ফিরে এসেছি।

বলতে বলতে শফির গা থরথর করে কাঁপতে লাগল। শফি রীতিমত আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়েছে।

মনে হয়েছিল শফি তার বিবিকে ডাকবে। আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। তার কিছুই হলো না। জানালো তার নামাজের সময় হয়ে গিয়েছে। আমারা অবাক হয়ে ফিরে এলাম। সেই বয়স্ক লোকটিই দরজা বন্ধ করলেন। আকন ভাই জানালেন, এই বুড়োটাই পাইক্যা কর্নেল আশরাফ।

এর দিন তিনেকের মধ্যে আকন ভাইই খবর দিলেন,শফি খুবই অসুস্থ। কুইন্স হাসপাতালে আছে। মেন্টাল হেলথ ডিপার্টমেন্টে আগের সাইক্রিয়াট্রিস্ট তাকে দেখছেন। তার এগারোফোবিয়া। ভয়ে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরোবার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। যেন বাইরে বেরোলেই তাকে মারার জন্য অসংখ্য লোক ওৎ পেতে আছে। হাতের নাগালে পেলেই মেরে ফেলবে। আগের ওষুধই চলছে। শুধু মাত্রা বেড়েছে। সপ্তাহ খানেক হাসপাতালে থেকে এসেছে শফি।

শফি কাজে যোগ দিল। শফি দাড়ি কাটে না। বড়ো হয়ে চলেছে। চোখে কিছুটা সুরমা দিয়েছে। একটু লজ্জা লজ্জা করে শফি জানালো, তার বিবি লাগিয়ে দিয়েছে। বিবির তুলনা নেই।

সুরমা বড়ো নবী চোখে দিতেন। মুসা নবী আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি মুসাকে তুর পাহাড়ের দিকে তাকাতে বলেছিলেন। আল্লার নূরে তুর পাহাড় পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সেই পাহাড়ের ছাই হলো সুরমা।

সুরমা চোখে দিলে চোখ ভালো থাকে। আর ছোয়াব হয়।

এইকথা বলে, শফি আমাদের চোখে সুরমা লাগিয়ে দিল।

একদিন শফি আমাকে তার ধর্ম গ্রহণের দাওয়াতও দিলো। একটা পবিত্র পুস্তকের ইংরেজি ভার্সনও দিয়ে বলল, আমি চাই তুমি জাহান্নামের আগুণে পুড়ো না। বেহেশতের অধিকারী হও।

এসব দেখেশুনে আকন ভাই বলেন, কইছি না, পাইক্যাদের বিশ্বাস নাই।

পুরো দস্তুর ধর্মে ফিরে গেল শফি। তার বাসাতেও আর আমাদের যাওয়ার সুযোগ নেই। দেখা হলেই আগের মতো আর হিন্দি সিনেমা, গান বা কারিনা কাপুরকে নিয়েকোনো কথা বলে না। মার্কিন দেশের ব্যাপক নিন্দেমন্দ করে।

এর মধ্যে একদিন অফিসে এসে একটু আড়ালে ডেকে নিল। ফিসফিস করে বলল, বাসায় জিনপরীর আছর দেখা দিয়েছে।

--সে কী রকম? এই প্রশ্নটি শুধাতে শফি বলল, সে এক জোড়া জুতা পেয়েছে। জুতা জুড়ো রাতে যেখানে রাখে পরদিন সেখানে পায় না। পায় অন্য জায়গায়। যেমন কখনো পায় খাবার টেবলের উপরে। কখনো রেফরিজারেটরে, ক্লোজেটে। কখনো বালিশের নিচে। এই জুতা তার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। তার বিবি বলেছে, জুতার মধ্যে ভালো জিন আছে। এই জুতা পরলে তার আতঙ্ক দূর হয়ে যাবে। শরীরে জোর বাড়বে। ওষুধপত্র খাওয়া লাগবে না।

জিজ্ঞেস করলাম, জুতা জোড়া কোথায় পেয়েছ?

--স্ত্রী দিয়েছে। পাকিস্তান থেকে নিয়ে এসেছে কর্নেল আশরাফ চাচা। কোনো এক পীর তাকে দিয়েছেন।

বললাম, শফি এই জুতার মধ্যে কোনো জিনটিন নেই। স্থান পরিবর্তনের কোনো ক্ষমতাই নেই জুতার। তুমি ঘুমিয়ে পড়লে তোমার বিবিজানই জুতাজোড়া সরিয়ে রাখছে। এটা এক ধরনের মনের চিকিৎসাপদ্ধতি। যেমন পীর ফকিররা মাদুলী দেয়। সেই মাদুলী ধারণ করলে মনের অসুখ সেরে যায়। এর মধ্যে মাদুলীর কোনো কৃতিত্ব নেই। মাদুলী তার অসুখ সারাতে সক্ষম-- এই ধরনের বিশ্বাস রোগীর মধ্যে গেঁথে যায়। রোগী বিশ্বাস করে ভালো হয়ে যায়।

এ কথাকে শফি ঠিক পুরোপুরি বিশ্বাস করল বলে মনে হয় না। শফি বলল, ঘুমিয়ে পড়লে আমার বিবি আর রাতের মধ্যে জাগে না। আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। জেগে উঠলে আমি টের পেতাম। তাছাড়া বিবির মধ্যে কোনো তঞ্চকতা নেই। সরল তার প্রাণ। তার ভালোবাসায় কোনো খাঁদ নেই।

এরমধ্যে নাইজেরিয়ায় ইসলামী শরিয়া ভিত্তিক বোকা হারাম ত্রাস সৃষ্টি করতে শুরু করেছে, সিরিয়ায় আইসিস ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশেই জঙ্গী কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন দেশটিও বসে নেই। ন্যাটোর জোটের মাধ্যমে এই জঙ্গীগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে। এসব ঘটনায় শফির আতঙ্ক বেড়ে যাওয়ার কথা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, না। শফি এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। যতবারই পৃথিবীর নানা জায়গায় জঙ্গী আক্রমণ হচ্ছে শফি ততই উৎফুল্ল মনে বাইরে চক্কর মেরে বেড়াচ্ছে। বিবিকে নিয়ে নয়-- একা একা ঘুরছে। আর নিউ ইয়র্ক শহরে বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছে।

দিনটা ছিল আমেরিকার থ্যাংক্স গিভিং ডে। লোকজন উৎসব করে ধন্যবাদ জানাচ্ছে একে অন্যকে। ধন্যবাদ জানাচ্ছে দেশকে--পৃথিবীকে। এমন কি যে রেস্টুরেন্টে তারা খায় তার ওয়েটারকেও ধন্যবাদ দিতে ভুল করছে না। উৎসবের মেজাজে সবাই বেড়াতে বের হচ্ছে। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। সাবওয়েতে মানুষের ভীড়।

অফিসে রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ আগে শফির টেক্সট মেসেজ পেলাম। লিখেছে--জীবন অপেক্ষা জান্নাত প্রিয়। তুমিও জান্নাতের পথে এসো। আল বিদা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শফির সঙ্গে দেখা হবে সাবওয়েতে। এর মধ্যে এ ধরনের টেক্সট মেসেজ পেয়ে অবাক লাগল। আকন ভাই মুচকি হেসে বললেন, শফি বোধ আবার পাগল হয়ে যাচ্ছে।

জ্যাকসন হাইটস সাবওয়েবে এসে দেখি শফির দেখা নেই। একের পর এক ট্রেন আসছে-- যাচ্ছে। আমরা যাবো কুইন্সে এফ ট্রেনে। শফির জন্য অপেক্ষা করব কিনা আকন ভাইকে শুধালাম। তিনি বললেন, অপেক্ষা করলে অফিসে পৌঁছাতে দেরী হয়ে যাবে। আমরা সময় মতোই চলে যাবো। শফি তার মতো আসুক।

মনের মধ্যে খচ খচ করতে লাগল। এফ ট্রেন আসছে তীব্র সার্চ লাইট জ্বেলে। ধীরে ধীরে তার গতি কমে যাবে। গতি যখন খুব কমে আসছে তখন দেখতে পেলাম ভীড়ের মধ্য থেকে কে যেন পাখির মতো চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকজন হৈ চৈ করে উঠল। আমাদের পাশে একজন মধ্য বয়সী সাদা মহিলা সেটা দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল। চেঁচিয়ে বলল, জিসাস, সেভ হিম।

এফ ট্রেন থেমে গেল। লাল বাতি জ্বলে উঠল। ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল। সাবওয়েতে সাইরেন বাজতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে পড়ল। ফায়ার ডিপার্টমেন্ট আসবে। মেডিকেল টিম আসবে। এসব দেখার সময় নেই।

পাশের লাইনে ই ট্রেইন এসে থামল। সেই ট্রেনে করে অফিসে চলে এলাম।

অফিসে যাওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে জোসেফ তার অফিস রুমে ডেকে নিল। টিভিতে তখন জ্যাকসন হাইটসের সাবওয়ের ঘটনা দেখাচ্ছিল। নিউজ কাস্টার বলছে, একজন লোক কুইন্সবাউন্ড এফ ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। তার সঙ্গে একটি ব্যাগ ছিল। ব্যাগের মধ্যে দুটো মাঝারী সাইজের ফুটবল সাইজের বস্তু আছে। সেটা বুঝতে পেরে পুরো এলাকাটি কর্ডন করে ফেলে পুলিশ। তারা মনে করছে, এটা কোনো টেররিস্ট একটিভিটি হতে পারে। কোনো আত্মঘাতি বোমা হামলাও হতে পারে। ব্যাগে ফুটবলে মতো গোল বস্তু দুটো হয়তো কোনো মারণঘাতি বোমাই হবে।

বোমা বিশেষজ্ঞ্রা এসে খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যাগ খুলেছে। বোমা সদৃশ্য বস্তু দুটি বের করেছে। দেখে তারা অবাক হয়েছে। এ দুটো বোমা নয়—বাঁধা কপি।

বাঁধাকপি কেনো? পুলিশ মনে করছে, লোকটি রান্নার জন্য সব্জি কিনে বাড়ি ফিরছিল। এভরিথিং ইজ ওকে। টুপি খুলে ডেডবডিকে তারা সম্মান জানালো।

লোকটির পরিচয় টিভি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি। শুধু বলা হচ্ছে--ট্রেন লাইন ক্লিয়ার করা হয়েছে। আবার ট্রেন চলা শুরু করেছে।

আমরা জোসেফের রুম থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার কাছে যেতেই জোসেফের ডাকে ঘুরে দাঁড়ালাম। জোসেফ বলল, লোকটার নাম জানো তোমরা?

আমরা মাথা নাড়ি। জানি না।

জোসেফ মাথা থেকে টুপিটা খুলে বলল, তোমরা জানো।

--কে?

--শফি। পাকিস্তানী শফি। পুলিশ আমাকে ফোন করেছিল। শফির ব্যাগে আমার ফোন নং পেয়েছে।

আমরা বিমূঢ় হয়ে যাই। শুধু আকন ভাই হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন।

দুদিন পরে কুইন্সের পাকিস্তানী মসজিদে শফির জানাজা হলো। এই প্রথম আমরা পাকিস্তানী মসজিদে গেলাম। জানাজা শেষে একজন প্রবীণ লোক আমাদের ডেকে নিলেন। জানালেন, শফির পরিবার আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়। তবে এখানে নয়। এখন নয়। কদিন পরে।

দিন সাতেক পরে শফির এপার্টপেন্টে গেলাম আমরা। শফির কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ছিলেন। দোয়া দরুদ পড়া চলছে। তখনো বাড়িময় শোকের আবহ। সেখানে সেই বয়স্ক কর্নেল আশরাফকে দেখতে পেলাম না। উঠে আসার আগে ভেতর ঘরে নিয়ে নিয়ে গেলেন আমাকে এক প্রবীণা। সেখানে হিজাব পরে বসেছিল শফির বিবি--বিবি।

সালাম বিনিময়েত পরে বিবি রিনরিনে গলায় বলল, শফি আপনার কথা প্রায়ই বলত। আপনাকে খুব পছন্দ করত।

আমার গলা কান্নায় আটকে আসছিল। কোনোভাবে সামলিয়ে হুট করে বলে ফেললাম, এ কী হয়ে গেল ভাবী? শফি তো আত্মহত্যা করার মতো লোক ছিল না।

বিবি বসা থেকে উঠল। ড্রয়ার থেকে একটা ডাইরি বের করল। একটা পাতা খুলে আমার দিকে এগিয়ে দিল।

শফি সাইক্রিয়াট্রিস্টের পরামর্শক্রমে নিয়মিত ডাইরি লিখত।

শেষ লেখাটিতে শফি লিখেছে--

আমাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। কিছু একটা করা দরকার। এর প্রতিবাদে এই দেশটির বিরুদ্ধে আত্মঘাতি হামলা চালানো দরকার। কিন্তু আমার কাছে কোনো অস্ত্র বা বোমা নেই। তাই বোমা সদৃশ্য বাঁধা কপি নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেবো। আর কেউ বা বুঝুক, আমি তো মনে করে নিচ্ছি, বাঁধা কপি দুটো সব্জি নয়--ভয়ঙ্কর বোমা। মার্কিন দেশের যাত্রীভর্তি একটা ট্রেন উড়িয়ে দিচ্ছি।

তাহলে শফি ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেনি? বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। সে একটা ট্রেন উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল?

বিবি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ শব্দহীন কান্না করল। বলল, আমাকেও কখনো এসব বলেনি। ফোনে বিয়ে হওয়ার পর থেকে আমাকে কারিনা কাপুর বলে ডাকত। কারিনা কাপুরের মতো নাচগান শিখতে বলেছিল। বলেছিল, নিউ ইয়র্কে এলে ইন্ডিয়ান ড্যান্স স্কুলে ভর্তি করে দেবে।

দীর্ঘ শেষ আবার বলল, কী যে হয়ে গেল। শুরুতে ভালোই ছিল। কিন্তু পাল্টে গেল, ঐ জুতাজোড়া পরতে শুরু করার পরে।

--কী জুতা?

--কর্নেল আশরাফ চাচা দেশ থেকে এনে দিয়েছিল। চাচা বলেছিল, এই জুতা পরলে শফির বিমারী সেরে যাবে। কিন্তু ঘটল উল্টা। জুতাজোড়া পরার পরে শফি এই সর্বনাশা পথে চলে গেল।

--জুতাজোড়া কার? শুধালাম।

--লাদেনের জুতা। ঠাণ্ডা গলায় শফির বিবি জানালো। পাকিস্তানের আবেটাবাদ থেকে নিহত লাদেনের জুতাজোড়া সংগ্রহ করেছিলেন চাচামিয়া।

সন্ধে হয়ে এসেছে। শফির বাসা থেকে উঠতে হলো। শফির বিবি একটু মাথা সোজা করল। জানালা দিয়ে একটা দমকা হাওয়া উঠল। সেই হাওয়ায় বিবির মাথার হিজাবটি খুলে গেল। দেখতে পেলাম, সেই মুখ বিবির নয়, সত্যিকারের কারিনা কাপুর আমাদের সামনে দাঁড়ানো। যেন এখনি নেচে গেয়ে উঠবে, বোলে চুরিয়া--

বোলে চুরিয়া নয়, শফির বিবি জলভরা চোখ নিয়ে খুব আস্তে করে বলল, জুতাজোড়া চাচাজান নিয়ে গেছেন।



Post a Comment

0 Comments