Friday, September 27, 2019

আমার মহালয়া

পূজা মানেই হল আমাদের মহালয়া।

কবে দুর্গা পূজা সেটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা ছিল না। শুধু হিসেব করা হত কোন ভোরে মহালয়াটি হবে। সে জন্য আমাদের কিছু প্রস্তুতি ছিল। সেটা শুরু হত আমাদের দূর সম্পর্কের জেঠী কালিপদর মার তরফ থেকে। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি তিনি দুটো পাকা তাল নিয়ে আসতেন আমাদের বাড়ি। এসে আমার মাকে শুধাতেন খোকার বাবা কখন ফিরবে কাজ থেকে। বাবা ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। সে অবধি কালিপদর মা আমাদের রান্না ঘরের বারান্দায় বসে থাকতেন। মাঝে মাঝে পান তামুক মুখে দিতেন। দুটো ডাল-ভাত খেতেন। তারপর বাবা ফিরলে তাগিদ দিয়ে বলতেন, ময়ালয়া কিন্তু চালাইও বাপধন। ভুইল্যা যাইয়োও না।

বাবা ভুলতেন না। কিছুদিন ধরেই আমাদের ভাঙ্গা রেডিওটা কাউকে ধরতে দিতেন না। ওটা গুড়াগাড়া কেউ ধরলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ব্যাপারে আমাদের ঠাকুরদাও বেশ সতর্ক থাকেন। আমাদের রেডিওর উপর চাপ কমাতে এই সময় বাইরে থেকে তিনি আকাশবানী শুনে আসতেন।

আর বাবা কাজ থেকে ফিরে নিয়মিত রেডিওর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন। কখনো একটু জোরে—কখনো একটু আস্তে করে ভলিউম বাড়ানো কমানো করতেন। পিছনের স্ক্রু খুলে ঝাড়া-মোছা করতেন। আবার মোড়ের নিখিল মিস্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে একটু সারাই করে আনতেন। কোনো ভাবেই যেন মহালয়ার দিনে রেডিওটা বিগড়ে না যায়। মহালয়ার আগের দিন মা পাঁচ প্রকার শাক তুলে আনতেন। সেটা দিয়ে রাতে সুক্তো রাঁধা হত। আর করা হত সিঁয়োই পিঠে। আর হাড়ি ভরে হত দিঘা ধানের পান্তা ভাত।

Saturday, July 13, 2019

ইভান বুনিন'এর গল্প : মৃদু শ্বাস

ভাষান্তরঃ কুলদা রায়

কবরস্থানে পরিস্কার মাটির উপরে একটি নতুন ক্রুশ কাঠ দাঁড়িয়ে আছে। ওক গাছের এই ক্রুস কাঠটি বেশ শক্ত সামর্থ্য, বড়োসড়ো, মসৃণ। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। 

এখন এপ্রিল মাস। কিন্তু দিনগুলো ধূসর। দূর থেকে যে কেউই নেড়া গাছগুলোর ভেতর দিয়ে কবরস্থানের সমাধীপাথর দেখতে পাবে। এটা বেশ নামী ক্যাথিড্রাল কবরস্থান। শহর হলেও এই কবরস্থানটিতে একটি গ্রামীন পরিবেশ আছে।


ঠাণ্ডা হাওয়া শিস কেটে যায়। শিস কেটে যায় ক্রুসকাঠের গোড়ায় রাখা পুষ্পগুচ্ছের ভিতর দিয়ে। ক্রুসকাঠে ব্রোঞ্জের তৈরি বড়ো ফলক রয়েছে। এতে একটি খুব চটপটে ও আকর্ষণীয় স্কুলবালিকার মাঝারী আকারের ছবি আঁকা আছে। তার চোখ দুটি হাসিখুশি আর অবাক করার মতো উজ্জ্বল। 
তার নাম ওলগা মেস্কারক্সি। 

সে ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে। 

তার স্কুলের মেয়েরা চপল। তারা করিডোর ও ক্লাশরুমে কলরব করে। তাদের পরনে বিসদৃশ্য বাদামী কটকটে পোষাক। এদের সঙ্গে এই ওলগা মেয়েটিকে আলাদা করার উপায় ছিল না। তাকে দেখে খুব বেশি হলে কেউ হয়তো বলতে পারত, সুন্দরী, ধনী আর সুখী ছোট্ট মেয়েদের অন্যতম। কিন্তু সে বেশ বুদ্ধিমতি, আমুদে। ক্লাশের নীতিবাগিশ শিক্ষককে থোড়াই কেয়ার করতো। তারপর সে বেড়ে উঠতে শুরু করেছিল। ফুলের মতো ফুটে উঠছিল। সেটা বহুদিন ধরে নয়-- যেন ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার এই বাড়বাড়ন্ত হচ্ছিল। চৌদ্দ বছর বয়সে, তার কোমর হয়েছিল সরু। কমনীয় পা দুটো। এর মধ্যে পরিপুষ্ট স্তনরেখা উঁকি দিচ্ছিল। এইসব দেহরেখার আকর্ষণ কোনো মানবিক ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। 

পনেরোতে রূপসী বলে তার নাম ডাক ছিল। তার স্কুলের বান্ধবীরা সে সময়ে কতো যত্নই না নিতো তাদের চুলের, তারা কী পরিস্কার পরিচ্ছন্নই না থাকত, আর তারা চলাফেরার মধ্যে ছিল সতর্ক আর সাবধানী। কিন্তু এসব ব্যাপারে ওলগার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কোনো কিছুকেই ভয় ছিল না। তার আঙ্গুলে কালির দাগ লেগে থাকে, মুখের লালচে আভা, এলোমেলো দুরন্ত তার চুল, অথবা তাড়াহুড়া করে যাওয়ার সময়-- ডিগবাজি খেয়ে পড়ে।  তখন তার হাঁটু বের হয়ে যায়।  তাতে তার কোনো মাথা ব্যথা ছিল না।