Wednesday, January 10, 2018

মার্কেজের শত বর্ষের নির্জনতা

প্রথম আলোতে লেখক আনিসুল হক বলেছেন-- তিনি ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে অনুষ্ঠিতব্য বাংলা একাডেমির বই মেলার জন্য একটি উপন্যাস লিখবেন।

উপন্যাসটির কোনো প্লট বা আউটলাইন অথবা একটি লাইনও তিনি লেখেননি। দাবী করেছেন-- মাত্র তিনদিনেই উপন্যাসটি লিখে শেষ করবেন। তারপর সেটা প্রথমা প্রকাশনী বই আকারে বের করবে। বইমেলায় একটি চেয়ারে বসে আনিসুল হক পাঠকদের জন্যে বইটির ব্লাঙ্ক পেজে অটোগ্রাফ দেবেন।


কী অসাধারণ তথ্য--মাত্র তিনদিনে একটি উপন্যাস লিখে ফেলেন আনিসুল হক। আনিসুল হক বাংলাদেশের লেখক। বাংলাদেশেই তার কিছু পাঠক আছে। এর বাইরে তার লেখা কেউ পড়ে না। কেউ রেফারও করে না। প্রতিবছরই বেশ কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। অনুমান করা যায় তার বইয়ের সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। কিন্তু তিনি পরিচিত 'মা' নামের একটি উপন্যাসের লেখক হিসেবে। উপন্যাসটি ঠিক উপন্যাস নয়। একে কেউ কেউ ডকু ফিকশন গোত্রের বলে থাকেন। বাকি উপন্যাসগুলোর নাম কেনো করেন না? কারণ এগুলো উপন্যাসের পর্যায়েই পড়ে না। অতি হালকা লেখা।

কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র অশ্বচরিত উপন্যাসটি লেখেন সাত বছর সময় নিয়ে।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড উপন্যাসটি লিখেছিলেন তিন দিনে নয়--২১ বছর ধরে। উপন্যাস কোনো চটি নয় যে দু তিন দিনেই লেখা সম্ভব। 
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া ১৯৪৪ সালে একটি মাস্টারপিস উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করেন। সে লক্ষে লিখতে শুরু করেন দি হাউস নামের উপন্যাস। সেটা ছিল তাঁর লেখক জীবনের শুরু।
১৯৫০-৫২ সাল পর্যন্ত এই তিন বছরে মার্কেজ বেশ কিছু ছোটো গল্প লেখেন বেশ কয়েকটি পত্রিকায়। এই গল্পগুলোতে বুয়েন্ডিয়া পরিবারের নানা ঘটনা এনেছেন ও কয়েকটি চরিত্র নির্মাণ করেছেন যারা শতবর্ষের নির্জনতা উপন্যাসেও প্রধান চরিত্র হিসেবে এসেছে। মার্কেজই তিন বছরে দি হাউস উপন্যাসটি শেষ করার চেষ্টা করেন। উপন্যাসটির পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০০। এ কাজটির মধ্যে দিয়ে তার সেই মাস্টারপিস লেখার সাহস পান। তিনি বুঝতে পারেন তিনি লিখতে পারবেন তার স্বপ্নের উপন্যাসটি।

১৯৫৫ সালে দুটি গল্প লেখেন--শনিবারের পরের একটি দিনে ও মাকন্দোতে বৃষ্টি দেখেছিল ইসাবেলা। দুটি গল্পে তিনি মাকোন্দো এলাকাটি সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলেন। এই মাকোন্দ এলাকাটিই তার ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড উপন্যাসের পটভূমি।

১৯৬৫ সালে মার্কেজ সপরিবারে একদিন ছুটি কাটাতে গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন একাপুলকোতে। এ সময়ে তার মাথায় কয়েকটি লাইন চলে এলো। আর গাড়ি চালাতে চালাতেই তিনি একটি স্টোরিলাইনও পেয়ে গেলেন। তারপরই তিনি লিখতে শুরু করলেন। বুঝতে পারলেন দেরি করা ঠিক হবে না। লেখাটা ঘনীভূত হয়ে আসছে। তিনি ছুটি বাতিল করে দিয়ে মেক্সিকোর বাড়ি ফিরে এলেন।

বাড়িতে ফিরে মার্কেজ আঠার মাস কাটিয়ে দিয়ে দিলেন লেখাটি নিয়ে। এ সময়ে 
জীবকার জন্য তিনি আর কোনো কাজ করলেন না। তার স্ত্রী তখন কাজ করতেন। তাতে তাদের কোনো মতে খাওয়াটা জুটতো।

সেটা ১৯৬৬ সালের ঘটনা। তিনি প্রতিদিনই এই উপন্যাসটির কিছু না কিছু লিখেছেন টাইপরাইটারে। লেখেন আর পড়েন। পড়ে ভালো না লাগলে তিনি সেই পৃষ্ঠাটি ছিড়ে সোজা গার্বেজ বাক্সে ফেলে দেন। আবার লিখতে বসেন। ছেড়া কাগজে তাঁর লেখার ঘর ভরে ওঠে। এভাবে ২১ বছরে ধরে তার পরিকল্পিত ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচুড বা শতবর্ষের নির্জনতা উপন্যাসটি লেখা শেষ করেন।

এর বছরখানেক পরে উপন্যাসটির স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয়। তারপর এ উপন্যাসটি সর্বকালের সেরা উপন্যাসের অংশ হয়ে ওঠে।

মার্কেজ তাঁর লেখক জীবনে মাত্র ছয়টি উপন্যাস লিখেছেন। নভেলা লিখেছেন পাঁচটি। গল্প লিখেছেন ৪১টি।

No comments: